২০২৬ সালে মা মনসা পূজা কবে? শ্রাবণে নাকি ভাদ্রে? জেনে নিন সব তারিখ, সময় আর পুজোর নিয়ম। রইল বাড়ির পুজোর টিপস।
আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে। ভাদ্র মাস এলেই বুঝতাম, এখন মনসা পুজো আসছে। বাড়ির মহিলারা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আমি তখন ছোট, শুধু বুঝতাম ওই দিন রান্না হয় না। কী মজার ছিল না?
কিন্তু শহরে বড় হওয়া অনেকেই আজকাল জানেন না, মনসা পূজা আসলে কবে হয়। কোনো বছর হয় আষাঢ়ে, কোনো বছর শ্রাবণে, আবার কোনো বছর হয় ভাদ্রে। কনফিউজিং, তাই না?
চিন্তা নেই। এই ব্লগে আমি ২০২৬ সালের জন্য মা মনসা পূজার সব তারিখ আর সময় একদম গুছিয়ে দিচ্ছি। বাংলা ক্যালেন্ডার মাথায় রাখার দরকার নেই।
বসো। শুরু করা যাক।
২০২৬ সালে মনসা পূজা কত তারিখে? এক নজরে দেখে নিন
প্রথমেই বলে নিই, মনসা পূজা কিন্তু এক দিনে হয় না। এই পুজোটা বছরে কয়েকবার হয়।
কিন্তু সবচেয়ে জাঁকজমক আর আড়ম্বরপূর্ণ যে পুজোগুলো হয়, সেগুলো হলো আষাঢ় মাসের পঞ্চমী তিথি আর ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে।
আমার মা বলতেন, "বাপু, মনসা তো সাপের দেবী। তাকে খুশি রাখতে গেলে সারা বছরই পুজো দিতে হয়।" কিন্তু যেহেতু সবাই পারে না, তাই জনপ্রিয় কয়েকটা দিনেই ভক্তদের ঢল নামে।
২০২৬ সালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো এই রকম:
৩০ জুন, ২০২৬ (মঙ্গলবার) – আষাঢ় মাসের অমাবস্যা (আনুমানিক)
৫ জুলাই, ২০২৬ (রবিবার) – আষাঢ়/শ্রাবণের প্রথম পঞ্চমী
১৮ জুলাই, ২০২৬ (শনিবার) – দ্বিতীয় পঞ্চমী
৩ আগস্ট, ২০২৬ (সোমবার) – তৃতীয় পঞ্চমী
১৭ আগস্ট, ২০২৬ (সোমবার) – চতুর্থ পঞ্চমী (এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বুধবার) – ভাদ্র সংক্রান্তি / রান্না পুজো (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
ওই দেখলেন? এতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধুমধাম করে পুজো হয় ১৭ আগস্ট ও ১৬ সেপ্টেম্বর-এ।
আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের মনসা পূজা: মরশুমের শুরুতে মায়ের আরাধনা
বর্ষা মানেই সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাস মানে মাঠে চাষবাসের সময়। তখন মানুষ সাপের ভয়ে কাঁদে।
ঠিক সেই সময়েই মনসা পূজার প্রচলন। মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন, যেন সাপের কামড় থেকে রক্ষা পান।
আমার এক কাকা কৃষক। ওর কথায়, "বর্ষায় ধানের জমিতে গেলেই হাতে পায়ে জোঁক লাগে। আর সাপ যে কত আছে সেখানে! তখন মনসা মাকে স্মরণ না করলে উপায় কী?"
২০২৬ সালের আষাঢ় মাস শুরু হচ্ছে ১৬ জুন আর শেষ হচ্ছে ১৭ জুলাই। এই পুরো মাসে প্রতি পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে মনসা পুজো হয়।
১৭ আগস্ট কেন এত বিশেষ?
১৭ আগস্ট ২০২৬, সোমবার। এটি শ্রাবণ মাসের পঞ্চমী তিথি।
স্থানীয় পঞ্জিকাগুলোতে এই তারিখটিকে ‘মনসা পঞ্চমী’ বা ‘অষ্টনাগ পূজা’ বলা হয়।
এই দিনে ঘরে ঘরে মাটির মনসার মূর্তি স্থাপন করা হয়। 'মনসার ভাষান' পাঠ করা হয়। নারকেল-গুড়ের নৈবেদ্য দেওয়া হয়।
আমার দিদিমার বাড়িতে তো বড়সড় আয়োজন হতো। আমি এখনো মনে করতে পারি ওই দিন সবার হাতে খড়ি বাঁধা থাকত। আর গোটা বাড়ি ধূপের গন্ধে ভরে যেত।
ভাদ্র সংক্রান্তির মনসা পূজা: অরণ্ধন আর রান্না পুজোর মজার গল্প
এবার আসি সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশে। যাকে বলে ‘রান্না পুজো’ বা ‘অরণ্ধন’।
২০২৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, বুধবার। এই দিনটিতেই হয় ভাদ্র সংক্রান্তি। আর এই দিনেই পালিত হয় বিশেষ মনসা পূজা।
কী জানো এই পুজোর সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা?
এই দিনে চুলায় আগুন জ্বালানো নিষেধ। একেবারে ঠিক শুনেছ। ‘অরণ্ধন’ মানেই ‘অর্থাৎ রান্না নেই’।
তো কী খাবে মানুষ? সহজ উত্তর—আগের দিন যা রান্না করা হয়েছিল, সেটাই খেতে হবে।
আমি ছোটবেলায় এই দিনটার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। কারণ আমাদের বাড়িতে আগের দিনই বিরিয়ানি বা পোলাও-মাংস রান্না করে ফেলতেন ঠাম্মা। আর পরের দিন ঠান্ডা সেটা খেতে কত মজা! ভাবতাম, এটা বুঝি ‘ফ্রিজের যুগের দারুণ আবিষ্কার’। কিন্তু তখন ফ্রিজ ছিল না, ছিল শুধু বিশ্বাস।
মেয়েরা এই দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পুরো বাড়ি গোছায়। এরপর ‘মনসা ঘট’ সাজানো হয়। পানি মানসা গাছের ডাল দিয়ে ঘট সাজানো বাধ্যতামূলক।
এই পুজোর আরেকটা নাম ‘ভাদ্র সংক্রান্তির মনসা পূজা’। এর পরের দিনই হয় বিশ্বকর্মা পুজো। তাই অনেকে দুটো উৎসব মিলিয়েই উদযাপন করেন।
কিভাবে করবেন বাড়িতে মনসা পুজো? সহজ নিয়ম
পুজো করতে গিয়ে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান—‘ঠিকমত করছি তো?’
আমি নিজেও একবার ভেবেছিলাম, এত নিয়ম আছে বুঝি? আসলে তেমন কিছু না। মনে রাখার মতো কয়েকটা জিনিস বলি।
জেনে নিন ছোট্ট টিপস
১. সকাল স্নান সেরে প্রথমে বাড়ির উঠোন বা পুজোর ঘর পরিষ্কার করুন। মনসা দেবী সাপের বাহন নিয়ে আগমন করেন, তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খুব জরুরি।
২. একটি ঘট স্থাপন করুন। সেটার গায়ে সাদা ও লাল সুতো বেঁধে দিন। ঘটের ওপরে আম্রপল্লব দিন।
৩. মনসা দেবী পাঁচ বা সাত রকমের ফুল পছন্দ করেন। বিশেষ করে বেল ফুল, জবা ফুল, শিউলি ফুল।
৪. নৈবেদ্য হিসেবে দিন নারকেল ননাড়ু, পাটালি গুড়, দুধ, চালের তৈরি পায়েস। বিশেষ করে নারকেল আর গুড়ের জিনিস খুব প্রিয়।
৫. ‘মনসা মঙ্গল কাব্য’ বা ‘মনসার ভাষান’ পাঠ করা শাস্ত্রসম্মত। না জানলে স্থানীয় পুরোহিতকে দিয়ে করিয়ে নিন।
৬. শুধু পুজো নয়, সাপের প্রতীক হিসেবে কোনো বাসি পাত্র উল্টে না রাখার রেওয়াজ আছে। ওইদিন মাটি খোঁড়া, গাছ কাটা বারণ।
আমার বন্ধু সৌরভ কিছু বছর আগে বাড়িতে পুজো দিয়েছিল। ও এমনিতেই একটু ফুরফুরে টাইপের। ওইদিন ও পুজোর নাম করে পার্টি বসিয়েছিল! আরে ভাই, অরণ্ধনের দিন কীভাবে রান্না হবে? ও আবার আগের দিন রান্না রেখেছিল ফ্রিজে কি না! আসলে ব্যাপারটা না জেনেই উৎসাহ দেখিয়েছিল।
ওর থেকে শিখে নিও—নিয়ম জানা জরুরি, কিন্তু ভক্তিটাই মুখ্য।
মনসা পূজার তাৎপর্য: শুধু ধর্মই নয়, এ যেন সামাজিক বন্ধন
শুধু সাপের দেবী বললেই হবে না মনসা মাকে।
তিনি শস্যের দেবী, প্রকৃতির দেবী। বর্ষার শেষে যখন নতুন ধান উঠতে শুরু করে, তখন কৃষকরা মনসা মায়েকে ধন্যবাদ জানান।
এটা একটা কৃষিভিত্তিক উৎসবও বটে।
পাশাপাশি, অরণ্ধন বা রান্না পুজোর দিনে কিন্তু দেখা যেত, বাড়ির সব মেয়েরা একসাথে বসে। জারি গান গাওয়া হয়। নাচগান চলে।
আমার এখনো বাসায় সেই পুরনো মনসা পুজোর ভিডিও ক্যাসেট আছে। সাদা-কালো। দিদিমা আর তার বান্ধবীরা গান করছেন।
এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। কিন্তু অপচয় নয়, সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এই পুজো সেই বাঁধনটাই তৈরি করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে।
FAQ – মনসা পূজা নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: ২০২৬ সালের মনসা পূজার সঠিক তারিখ কোনটি?
২০২৬ সালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনসা পূজার তারিখ হলো ১৭ আগস্ট (শ্রাবণ পঞ্চমী) ও ১৬ সেপ্টেম্বর (ভাদ্র সংক্রান্তি/রান্না পুজো)।
প্রশ্ন ২: ‘অরণ্ধন’ মানে কী? সেইদিন সত্যি কোনো রান্না করা যাবে না?
অরণ্ধন মানে ‘রান্না নেই’। বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাদ্র সংক্রান্তির দিন চুলা জ্বালানো নিষেধ। আগের দিন রান্না করা খাবার খেতে হয়।
প্রশ্ন ৩: নাগপঞ্চমী আর মনসা পূজা কি একই জিনিস?
প্রায় একই। নাগপঞ্চমী সারা ভারতেই পালিত হয়, মনসা পূজা মূলত বাংলা ও আসামে। তবে দুই জায়গাতেই শ্রাবণ মাসের পঞ্চমীতে সাপের দেবীর পুজো হয়।
প্রশ্ন ৪: শহরে থাকি, কীভাবে পুজো দেব?
শহরে বাড়ির ছাদেও পুজো দেওয়া যায়। ছোট একটা ঘট স্থাপন করুন। কল্পনা করুন ঘটের ভেতর দেবী বিরাজ করছেন। আন্তরিক ভক্তিই আসল।
প্রশ্ন ৫: পুজোর পরে কী ভোগ নিবেদন করা ভালো?
নারকেলের ননাড়ু, পাটালি গুড়, দুধ-চালের পায়েস। ফল হিসেবে কলা ও নারকেল খুবই প্রিয়।
৮ মিনিট রিডিং টাইম
পোস্ট পড়ে মনসা পূজার তারিখ যদি সহজে মনে থাকে, তবে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে দিন। অনেকেরই এই তারিখ নিয়ে কনফিউশন থাকে। আপনার শেয়ারই হয়তো কাউকে সাহায্য করবে সময়মতো পুজোর আয়োজন করতে।
আর হ্যাঁ, কবে পুজো দিচ্ছেন, কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না। 🙏
