মালদা ঘুরে দেখুন: ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মিশেল | Malda

মালদা ঘুরে দেখুন: ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মিশেল | Malda

মালদা ঘুরে দেখুন: ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মিশেল | Malda

মালদার গৌড়-পাণ্ডুয়ার ধ্বংসাবশেষ, আদিনা মসজিদ আর রামকেলি মেলা – ইতিহাস আর ঘুরতে ভালোবাসলে একবার যেতেই হবে।

মালদা ঘুরে দেখুন ইতিহাস আর প্রকৃতির এক অপূর্ব মিশেল

মালদা জেলার নাম শুনলেই প্রথমে কী মনে পড়ে? গুড়ের মিষ্টি নাকি পুরনো দিনের গল্প?

আমার নিজের যখন প্রথম মালদা যাওয়ার কথা মনে পড়ে, তখন কলেজে পড়ি। বন্ধুরা বলল, "চল, ইতিহাসের সাক্ষী হতে"। আর সত্যিই, গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।

এই জেলা শুধু কৃষিনির্ভর নয়। এর গায়ে লেগে আছে হাজার বছরের ধুলো। সুলতানি আমল, পাল যুগ, ব্রিটিশ শাসন – সব কিছুর ছাপ আছে এখানে।

তো আর দেরি কেন? জেনে নেওয়া যাক মালদা কী কী করে তুলছে নিজেকে অনন্য।

প্রথমেই জেনে নিন মালদার তথ্য

আয়তন ৩৪৫৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ। মুসলিম ও হিন্দু – দুই সম্প্রদায়ের মেলবন্ধন এখানে।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, এটা সব সময়ে ছিল না। আগে মালদা জেলার অস্তিত্বই ছিল না। পূর্ণিয়া আর দিনাজপুরের অংশ ছিল এটি।

আমার এক বন্ধু স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে। ওর কথায়, ১৮৫৯ থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত মালদা ছিল রাজশাহী বিভাগের অধীনে। পরে ভাগলপুর, আবার ফিরে আসে রাজশাহীতে।

১৯৪৭ সালে শিবগঞ্জ, নবাবগঞ্জ বাদ দিয়ে বাকি অংশ পড়ে ভারত অংশে।

এখন যারা ভাবছেন, ইতিহাস শুনতে শুষ্ক লাগে? একদমই না। কারণ এখানকার প্রতিটা ধ্বংসস্তুপের ভেতর লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব কাহিনি।

গৌড় মহল্লায় ঘুরে আসুন সুলতানি আমলে

জী হ্যাঁ। গৌড় মানেই মধ্যযুগের বাংলার রাজধানী। এখন যেটা ধ্বংসের স্তূপ, সেটাই একসময় ছিল জাঁকজমকের শহর।

 বারোদুয়ারি বা বড় সোনা মসজিদ

রামকেলি থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে। বিশাল আকার। নাম বারোদুয়ারি, কিন্তু দরজা আছে এগারোটি। কেন? জানেন? কেউ বলে না।

সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ শুরু করেছিলেন, শেষ করেন তার ছেলে নসরত শাহ ১৫২৬ সালে।

দৈর্ঘ্য ১৬৮ ফুট, প্রস্থ ৭৬ ফুট। ইট ও পাথরের কাজ দেখলে বুঝবেন, সে সময়ের কারিগররা কী শিল্পী ছিলেন।

আমি যখন প্রথম দেখি, ভেবেছিলাম এটা কোনো রাজপ্রাসাদ। ভুল ছিল সেটা।

 দাখিল দরওয়াজা আর ফিরোজ মিনার

একটা দরজা কল্পনা করুন, যার ভেতর দিয়ে হাতি-ঘোড়া সহজেই ঢুকতে পারত। ১৪২৫ সালের দিকে বানিয়েছিলেন বারবক শাহ। উচ্চতা ৬০ ফুট। একে ‘সেলামি দরওয়াজা’ বলা হতো। কারণ ওপর থেকে তোপধ্বনি করে বরণ করা হতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের।

এবার চলে যাই ফিরোজ মিনারে। কুতুব মিনারের মতো, কিন্তু ভিন্ন স্বাদের। সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহ বানান ১৪৮৫ সালে। ৮৪টি ধাপ ঘুরে ওঠার মজাই আলাদা।

ওখানে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখলে নিজেকে এক ইতিহাসের চরিত্র বলে মনে হয়।

 চিকা মসজিদ আর লুকোচুরি গেট

একটা মসজিদের নাম চিকা মানে বাদুর? হ্যাঁ। সুলতান ইউসুফ শাহের সময়ে এখানে বাদুরের উপদ্রব ছিল। তাই নাম চিকা মসজিদ। আরো মজার নাম – লুকোচুরি গেট। কিংবদন্তি আছে, সুলতান এখানে বেগমের সাথে লুকোচুরি খেলতেন। সত্যি কি না জানি না, কিন্তু গল্প মন্দ না।

 আদিনা: দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদের দেশে

মালদা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে আদিনা। এক সময় এখানে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক মসজিদ।

দৈর্ঘ্যে ৫২৪ ফুট, প্রস্থে ৩২২ ফুট। সিরিয়ার উমাইয়া মসজিদের আদলে তৈরি করেন সুলতান সিকান্দার শাহ ১৩৬৩ সালে।

৯৮টি খিলান, ২৬০টি থাম, ৩৮৭টি গম্বুজ ছিল। বেশিরভাগ এখন ধ্বংস। তবে ‘বাদশা কি তখত’ নামের জায়গাটা দাঁড়িয়ে আছে। ওখান থেকেই সুলতান পরিবারের মহিলারা নামাজ পড়তেন।

পাশেই সুলতান সিকান্দার শাহের সমাধি। এখানে এসে ইতিহাসপ্রেমীরা একটু বেশি সময় কাটান।

আমি ওখানে বসে ভেবেছিলাম, মানুষ কেন ধ্বংস করে নিজের ইতিহাস?

 পাণ্ডুয়া: গৌড়ের ছোট্ট ভাইসব

মালদা থেকে ১৮ কিলোমিটার দক্ষিণে পাণ্ডুয়া। এখানে আছে ছোট সোনা মসজিদ বা কুতুবশাহী মসজিদ।

সবচেয়ে চমক হলো একলাখি সমাধি। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন? এক লক্ষ টাকা খরচ করে নিজের সমাধি বানিয়েছিলেন সুলতান জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ (প্রাক্তন যদু)।

এটা বাংলার প্রথম আয়তাকার ইটের সমাধি। দেয়ালে এখনো টেরাকোটার কাজ চোখ ধাঁধায়।

আমার মনে পড়ে, ওখানে একজন স্থানীয় দাদা বলছিলেন, "বাবু, এই একলাখ টাকা তখন অনেক বড় টাকা ছিল।"

 তুলাভিটা আর জগজ্জীবনপুর – প্রত্নতত্ত্বের স্বর্গ

কথায় বলে না, ইতিহাস মাটির নিচেও থাকে!

মালদা থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে তুলাভিটা। ২০০০-এর দশকে এখানে পাওয়া গেছে পাল যুগের এক বৌদ্ধবিহারের সন্ধান।

আবিষ্কার হয়েছে ২৫০টির বেশি পোড়ামাটির ফলক। সিল ও সিলিং, টেরাকোটার মূর্তি।

সবচেয়ে বড় চমক – ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম ওজনের একটি তাম্রফলক। ওটায় লেখা আছে ‘মহেন্দ্র দেব পাল’ নামের এক রাজার কথা, যিনি ছিলেন দেবপালের পুত্র।

এখন যারা ভাবছেন, ইতিহাস মানেই বিরক্তিকর – একবার এসে দেখুন। মাটির নিচ থেকে হাজার বছরের গল্প উঠে আসে কীভাবে!

 ঘুরে আসুন এই কয়েকটা জায়গাও

  • মালদা জাদুঘর: ইতিহাসকে চোখের সামনে দেখতে চাইলে – এখানেই থাকবে উদ্ধার করা প্রত্নবস্তু।

  • রামকেলি: যেখানে শ্রী চৈতন্য কিছুদিন ছিলেন। জৈষ্ঠ্যের সংক্রান্তিতে সপ্তাহব্যাপী মেলা বসে। গ্রামের আমেজ, পুজো, আর উৎসব – একদম দারুণ।

  • আদিনা হরিণ প্রজনন পার্ক: ইতিহাসের সাথে প্রকৃতি। হরিণ দেখতে চাইলে সকালে যাবেন।

FAQ – কিছু ঘুরতে যাওয়ার আগে জেনে নিন

প্রশ্ন ১: মালদা ঘুরতে সেরা সময় কোনটা?
অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। গরম এড়িয়ে চলুন। বর্ষায় প্রচুর বৃষ্টি, রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে যায়।

প্রশ্ন ২: কীভাবে যাবেন?
ট্রেনে কলকাতা থেকে গৌড় এক্সপ্রেস বা অনেক ট্রেন যায়। বাসেও যেতে পারেন এসপ্ল্যানেড বা অন্য বাসস্ট্যান্ড থেকে। জেলা সদর ইংলিশ বাজার।

প্রশ্ন ৩: কোথায় থাকবেন?
মালদা শহরে সরকারি অতিথিশালা ও বেসরকারি হোটেল আছে। তুলনামূলকভাবে থাকার ব্যবস্থা সীমিত, তাই আগে বুকিং দেওয়া ভালো।

প্রশ্ন ৪: কী কী খাবেন?
মালদার বিখ্যাত গুড়ের মিষ্টি – না খেলে মিস করবেন। এছাড়া সাধারণ বাংলা খাবার পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ৫: গাইড পাবেন কি?
গৌড় ও আদিনার ধ্বংসাবশেষ এলাকায় ভালো গাইড পাওয়া যায়। ওরা জানে কোন পাথরের ইতিহাস কী বলে।

পোস্ট যদি ভালো লেগে থাকে, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না। কারণ ইতিহাস আর প্রকৃতির কথা সবার জানা উচিত।

★ আপনার প্রিয় তালিকা

তালিকা খালি আছে।