শেয়ার বাজার কী? NSE, BSE আর ডিমেট অ্যাকাউন্ট – সহজ ভাষায় পুরো ব্যাপারটা বুঝুন

শেয়ার বাজার, NSE কী, BSE কী, ডিমেট অ্যাকাউন্ট, স্টক মার্কেট বাংলা, কিভাবে শেয়ার কিনবেন, বিনিয়োগের শুরু

শেয়ার বাজার বোঝা কি কঠিন? NSE আর BSE মানে কী? ডিমেট অ্যাকাউন্ট ছাড়া কি লেনদেন হয়? সব প্রশ্নের উত্তর এখানে। জানুন খুব সহজ করে।

শেয়ার বাজার

"শেয়ার বাজার মানেই কি শুধু লোভ আর লস?"

আমার নিজের প্রথম শেয়ার বাজারের কথা শোনার সময়টা মনে পড়ে। তখন কলেজে পড়ি। এক বন্ধু বলল, "কাল টাটা স্টিল কিনেছি। আজই টাকা ডবল।"

আমি অবাক। এত সহজ? ওকে জিজ্ঞেস করলাম, "তো টাকা ডবল হলো?"

ও বলল, "আরে না, রাতে খবর দেখে শুনলাম কমে গেছে। কিছুই বুঝলাম না।"

ঠিক এই গল্পটাই প্রায় সবার। শেয়ার বাজার নিয়ে সবাই কথা বলে, কিন্তু কেউ সহজ ভাষায় বোঝায় না। টিভিতে শুধু সংখ্যা আর গ্রাফ। NSE, BSE, ডিমেট অ্যাকাউন্ট – শুনলেই কেমন যেন!

চিন্তা নেই। আজ আমি সবটুকু এমন করে বলব, যেন দাদুর আড্ডায় বসে গল্প শুনছ।

তো আসুন, ভয়টা সরিয়ে রাখি।

শেয়ার বাজার কী? এক কথায় কোম্পানির অংশের হাট

ভীষণ সহজ কথা বলি। ধরো তুমি আর তোমার এক বন্ধু মিলে একটা চায়ের দোকান খুললে। দোকানের নাম দিলে "আমাদের আড্ডা"।

এবার এই দোকানের মালিকানা ১০০ ভাগ। তুমি দিলাম ৫০ হাজার টাকা, বন্ধু দিলো ৫০ হাজার। মানে তুমি মালিকের ৫০% আর বন্ধু ৫০% 

এখন, দোকান ভালো চলছে। হঠাৎ সেবার আরেক বন্ধু এসে বলল, "আমিও এই দোকানের কিছু অংশ কিনতে চাই। টাকা দেব।"

তুমি আর তোমার বন্ধু ঠিক করলে, দোকানের ২০% অংশ বিক্রি করবে নতুন বন্ধুকে। সে দিল ২০ হাজার টাকা। এখন তিনজন মালিক।

ঠিক এই গল্পটাই শেয়ার বাজারের। বড় বড় কোম্পানিরা চায়ের দোকানের জায়গায় নিজেদের কিছু অংশ ('শেয়ার' বলে) সাধারণ মানুষকে বিক্রি করে। বিনিময়ে টাকা নেয়, ব্যবসা বাড়ায় 

আর সেই কেনাবেচার জায়গাটাই হলো শেয়ার বাজার বা স্টক মার্কেট।

তবে শুধু কেনাবেচা নয়। শেয়ার কিনলে তুমি ওই কোম্পানির ছোট্ট একটা মালিক হয়ে যাচ্ছ । কোম্পানি লাভ করলে লভ্যাংশ ('ডিভিডেন্ড' বলে) তুমিও পাবে। দর বেড়ে গেলে লাভে বিক্রি করতে পারবে।

এটাই আসল কথা। লটারি না। জুয়ার আসর না। এটা ব্যবসার অংশীদার হওয়ার গল্প।

NSE আর BSE আসলে কী? ভারতের দুই দৌড়োবার মাঠ

শেয়ার বাজারের কথা বললেই দুটো নাম শুনবে – NSE আর BSE।

এরা আসলে কী? এরা হলো স্টক এক্সচেঞ্জ। মানে শেয়ার কেনাবেচার দৌড় প্রতিযোগিতার মাঠ 

কেউ শেয়ার কিনতে চায়, কেউ বিক্রি করতে চায় – আর এই দুই পক্ষকে একসাথে আনার কাজটা করে এই এক্সচেঞ্জগুলো। তুমি ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে অর্ডার দাও আর সেটা পৌঁছে যায় এই মাঠে। সেখানে buyer আর seller এর মিল হয়। তারপর টাকা আর শেয়ার বিনিময় 

এবার দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী?

BSE (Bombay Stock Exchange) – এটার বয়স অনেক। শুরু ১৮৭৫ সালে। দুনিয়ার সবচেয়ে পুরনো এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি . BSE-তে সাত হাজারের বেশি কোম্পানির শেয়ার লিস্টেড আছে।

NSE (National Stock Exchange) – ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা। ১৯৯৪ সাল থেকে ট্রেডিং শুরু . এখন ভারতের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুততম এক্সচেঞ্জ।

সংক্ষেপে বললে, BSE হলো পুরনো দাদা, NSE হলো তার বাবু ভাই। কিন্তু দুজনেই দৌড় প্রতিযোগিতার মাঠ। একটু ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম, একটু ভিন্ন ভিন্ন দর্শক।

তবে তুমি তোমার ব্রোকারের মাধ্যমে দুটোতেই ট্রেড করতে পারো। আলাদা করে কিছু করতে হয় না।

একটা মজার তথ্য: আজকাল সেটেলমেন্ট সিস্টেম অনেক ফাস্ট। আগে শেয়ার কিনলে টাকা দিতে আর শেয়ার পেতে সময় লাগত ২ দিন। এখন 'T+1' সিস্টেমে পরেরদিনই শেয়ার তোমার ডিমেট অ্যাকাউন্টে চলে আসে 

ডিমেট অ্যাকাউন্ট কী? আর ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট দিয়ে কী হয়?

অনেকের ধারণা, শেয়ার কিনতে শুধু একটি অ্যাকাউন্ট লাগে। আসলে লাগে তিনটে – ডিমেট, ট্রেডিং আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।

কথাগুলো বলি।

ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট – তোমার অর্ডার নেওয়ার খাতা

ধরো, তুমি মোবাইলে ফুড ডেলিভারি অ্যাপ খুলে অর্ডার দিলে। ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট ঠিক সেরকম। সেটা হলো সেই অ্যাপ – যেখানে বসে তুমি ‘৫০ টা শেয়ার কিনব’ অর্ডারটা দাও 

এই অ্যাকাউন্ট NSE আর BSE-র সাথে কানেক্টেড থাকে। নাম ‘ট্রেডিং’ মানেই তো লেনদেন। অর্ডার নেয়, পাঠায়, এক্সিকিউট করে 

কিন্তু এই অ্যাকাউন্টে শেয়ার জমা থাকে না। শুধু লেনদেনের রেকর্ড।

 ডিমেট অ্যাকাউন্ট – আপনার ডিজিটাল তিজোরি

শেয়ার কিনলে সেটা কোথায় থাকবে? কাগজের সার্টিফিকেট? আরে না, এখন আর সেই ‘কাগজ হারিয়ে ফেলার ভয়’ নেই।

ডিমেট মানে ‘ডিম্যাটেরিয়ালাইজড’ – মানে কাগজের ফরম থেকে ছাড়িয়ে ইলেকট্রনিক করা 

ডিমেট অ্যাকাউন্ট হলো তোমার সেই ডিজিটাল বাক্স বা তিজোরি। যেখানে কেনা সব শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড জমা থাকে 

তোমার ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে ‘কিনলাম’ অর্ডার দিলে – টাকা গেল, আর শেয়ার এসে জমা হলো ডিমেট অ্যাকাউন্টে।

আগে মানুষ কাগজের শেয়ার সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরত। চুরি যেত, পচে যেত, ছিঁড়ে যেত। এই ঝামেলা থেকে বাঁচার জন্যই ডিমেট সিস্টেম 

প্রতি বছর ডিমেট অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণ করতে কিছু চার্জ (AMC – Annual Maintenance Charge) দিতে হয়। ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে । এটা জেনে রাখা ভালো।

তিন অ্যাকাউন্টের নাচ: কিভাবে একসাথে কাজ করে?

ঠিক আছে। তাহলে তিন অ্যাকাউন্ট দিয়ে ঠিক কী হয়? একটা উদাহরণ দেখি।

ধরো তুমি ১০০ টা শেয়ার কিনতে চাও।

১. তুমি ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুলে অর্ডার দিলে – “বাই ১০০ শেয়ার” 
২. তোমার ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট অর্ডার পাঠাল NSE/BSE-তে।
৩. এক্সচেঞ্জে তোমার সাথে একজন বিক্রেতার মিল হলো।
৪. তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নিল।
৫. আর টাকার বিনিময়ে শেয়ার চলে এল ডিমেট অ্যাকাউন্টে জমা হতে 

শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে উল্টো পথ। ডিমেট অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার বেরিয়ে গেল, টাকা চলে এল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

সংক্ষেপে:

  • ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট: অর্ডার দেওয়ার খাতা

  • ডিমেট অ্যাকাউন্ট: শেয়ার রাখার তিজোরি

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্ট: টাকা আসা-যাওয়ার জায়গা

এই তিনটে না থাকলে শেয়ার বাজারের গল্প শুরুই হয় না 

ডিমেট অ্যাকাউন্ট ছাড়াই কি শেয়ার কেনা যায়?

সোজা উত্তর – না।

SEBI-র (সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া) নিয়ম অনুযায়ী, ইকুইটি শেয়ার কিনতে গেলে ডিমেট অ্যাকাউন্ট রাখা বাধ্যতামূলক 

শুধু যদি ফিউচার আর অপশন (F&O) কিংবা কারেন্সি ট্রেড করতে চাও – সেখানে শুধু ট্রেডিং অ্যাকাউন্টও চলে। কারণ ওতে শেয়ারের বদনে টাকা দিয়ে সেটেলমেন্ট হয় 

কিন্তু ‘শেয়ার কিনে লং টার্মে রাখব’ – এই গোল করতে চাইলে ডিমেট ছাড়া উপায় নেই।

কারণ কাগজের সার্টিফিকেট নিয়ে আর কেউ ঘুরতে চায় না। আর নিরাপত্তার প্রশ্নেও ডিমেট অনেক ভালো 

ডিমেট অ্যাকাউন্ট খোলার জিনিসপত্র আর স্টেপ বাই স্টেপ প্রক্রিয়া

অনেক কঠিন মনে হয়? আসলে ব্যাপারটা প্রায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার মতোই।

কি লাগবে?

  • প্যান কার্ড (এটা কিন্তু মাস্ট। ছাড়া কোনো উপায় নেই) 

  • আধার কার্ড

  • ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিবরণ

  • মোবাইল নম্বর আর ইমেইল

প্রক্রিয়াটা কেমন?

১. যেকোনো ব্রোকারের ওয়েবসাইট বা অ্যাপে গিয়ে ‘খোলা অ্যাকাউন্ট’ ক্লিক করো।
২. মোবাইল নম্বর আর ইমেইল দাও।
৩. প্যান ও আধার কার্ড দিলে অনলাইনে অনেক কিছু ভেরিফাই হয়ে যায়।
৪. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লিংক করো।
৫. ‘ই-সাইন’ করে নিশ্চিত করো। বেশিরভাগ কাজই এখন ভিডিও কেওয়াইসি আর ওটিপির মাধ্যমে 

আমার এক ভাইজান ভয় পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, "উফফ, প্রচুর ডকুমেন্ট, অনেক ফর্ম।" কিন্তু বসে বসে অনলাইনে মাত্র ১৫ মিনিটে সব হয়ে গেছে। ফর্ম আর কাগজের ঘানি কমে গেছে অনেক।

অনেক ব্রোকার আবার ট্রেডিং আর ডিমেট একসাথেই খুলে দেয়। দুটো আলাদা করে কিছু করতে হয় না 

FAQ – শেয়ার বাজার আর ডিমেট অ্যাকাউন্ট নিয়ে ঘুরতে থাকা প্রশ্ন

প্রশ্ন ১: NSE আর BSE – আমার কোনটাতে ট্রেড করা উচিত?
দুটোতেই করা যায়। বেশিরভাগ ব্রোকার দুটো একসাথেই অ্যাক্সেস দেয়। NSE-তে ভলিউম বেশি আর ফাস্ট, BSE পুরনো। তুমি চাইলে দুই জায়গাতেই শেয়ার কিনতে পারো।

প্রশ্ন ২: ডিমেট অ্যাকাউন্টের চার্জ কত?
বেশিরভাগ ব্রোকারের কিছু না কিছু অ্যানুয়াল মেইন্টেন্যান্স চার্জ (AMC) থাকে। প্রায় ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত । কেউ কেউ প্রথম বছর ফ্রি দেন। খোলার আগে খোঁজ নিয়ে নিও।

প্রশ্ন ৩: শেয়ার কিনলেই কী লাভ হয় না?
লাভের গ্যারান্টি নেই। শেয়ার বাজার সবসময় ওঠানামা করে । দর কমে গেলে টাকা কমে যেতে পারে। তাই বোঝেশুনে কিনতে হয়। রাতারাতি ধনী হওয়ার জায়গা না এটা।

প্রশ্ন ৪: আমি খুব কম টাকা বিনিয়োগ করতে চাই। কি করব?
অনেক ব্রোকার এখন ৫০০ বা ১০০০ টাকাতেও শেয়ার কেনার সুবিধা দেয়। 'স্টক SIP' নামে অটো ইনভেস্টের ব্যবস্থাও আছে . ছোট থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে শেখা যায়।

প্রশ্ন ৫: ডিমেট অ্যাকাউন্ট কি বন্ধ করা যায়?
হ্যাঁ, পারো। কোনো চার্জ বাকি না থাকলে ব্রোকারকে রিকোয়েস্ট করলেই হয়। কিছু কাগজপত্র লাগতে পারে।

৭ মিনিট রিডিং টাইম

শেয়ার বাজার কিন্তু জটিল কোনো পরী测验 না। সহজ করে বুঝলে, নিয়ম মেনে শুরু করলে এবং ধৈর্য রাখলে – এটা হতে পারে নিজের জন্য একটা বাড়তি আয়ের দারুণ জায়গা।

আমার সেই কলেজ বন্ধুটা এখনো কখনো লাভ, কখনো লোকসান করে। কিন্তু বাজারের মেয়েটা বোঝার পর ওর কনফিডেন্স অনেক বেড়ে গেছে।

তোমার শেয়ার বাজার নিয়ে প্রথম ধারণাটা কেমন লাগলো? বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাদেরও জানতে দাও যে এই জিনিসটা আসলে ভয়ের কিছু নয়।

Post a Comment

NextGen Digital Welcome to WhatsApp chat
Howdy! How can we help you today?
Type here...