দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তার প্রাচীন ঐতিহ্য এবং পুরাকীর্তির জন্য বরাবরই পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আজ আপনাদের নিয়ে যাবো এমন এক জায়গায়, যেখানে বিজ্ঞান আর বিশ্বাস একাকার হয়ে মিশে গেছে। আমরা কথা বলছি কুশমণ্ডি ব্লকের বেতাহার গ্রামের ‘নড়বড়িয়া শিব’ মন্দির নিয়ে।
ইতিহাস ও কিংবদন্তি
কুশমণ্ডি সদর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বেতাহার গ্রামটি একসময় পাল ও সেন যুগের এক সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। স্থানীয় লোকগাঁথা অনুযায়ী, এখানকার এই শিবলিঙ্গটি কোনো সাধারণ পাথর নয়। এটি শত শত বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। জনশ্রুতি আছে যে, এই অঞ্চলে একসময় গভীর অরণ্য ছিল এবং সেখানেই মাটি খুঁড়ে এই অলৌকিক শিবলিঙ্গের সন্ধান পাওয়া যায়।
কেন এই নাম ‘নড়বড়িয়া’?
এই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর শিবলিঙ্গটি। সাধারণ শিবলিঙ্গ যেখানে শক্তভাবে ভূমির সাথে গেঁথে থাকে, এখানকার শিবলিঙ্গটি তার ব্যতিক্রম। অবাক করার মতো বিষয় হলো, বিশালাকায় এই পাথরের শিবলিঙ্গটিকে স্পর্শ করলে বা হালকা ধাক্কা দিলে সেটি সামান্য দুলতে থাকে—অর্থাৎ এটি ‘নড়বড়ে’। এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের কারণেই স্থানীয়রা ভক্তিভরে এর নাম রেখেছেন ‘নড়বড়িয়া শিব’।
বিস্ময়ের বিষয় হলো, বহু চেষ্টা করেও কেউ এই শিবলিঙ্গের তল খুঁজে পাননি এবং এত বছর ধরে হাজার হাজার ভক্তের স্পর্শ সত্ত্বেও এর নড়বড়ে বৈশিষ্ট্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
স্থানীয় বিশ্বাস ও মেলা
প্রতিবছর শিবরাত্রি উপলক্ষে এখানে এক বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, নড়বড়িয়া শিবের কাছে মনেপ্রাণে কিছু চাইলে তিনি কাউকে খালি হাতে ফেরান না। শিবরাত্রি ছাড়াও গাজন উৎসব এবং নীল পুজোয় এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
কেন ঘুরতে যাবেন?
১. প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব: মন্দিরের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন প্রাচীন পাথরের ভাস্কর্য আপনাকে ইতিহাসের পাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ২. আধ্যাত্মিক শান্তি: কোলাহলমুক্ত শান্ত পরিবেশে অবস্থিত এই মন্দিরটি মানসিক প্রশান্তির জন্য আদর্শ। ৩. বিজ্ঞান ও বিস্ময়: একটি বিশাল পাথর কেন এমন নড়বড়ে, তা নিজের চোখে দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
বিশেষত্ব: প্রতি বছর শ্রাবণ মাস (সাউন) এবং ফাল্গুন মাসে শিবরাত্রির সময় এখানে বিশেষ পুজো হয়, যেখানে বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেন।কীভাবে পৌঁছাবেন?
দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলা সদর বালুরঘাট বা রায়গঞ্জ থেকে বাস বা ছোট গাড়িতে করে কুশমণ্ডি পৌঁছানো যায়। কুশমণ্ডি ব্লক অফিস থেকে খুব সহজেই টোটো বা অটো নিয়ে আপনি বেতাহার গ্রামের এই নড়বড়িয়া শিব মন্দিরে পৌঁছাতে পারেন।
উপসংহার: আপনি যদি ইতিহাস ভালোবাসেন কিংবা রহস্যময় কোনো স্থানের সন্ধানে থাকেন, তবে উত্তরবঙ্গের এই লুকানো রত্নটি আপনার ভ্রমণ তালিকায় অবশ্যই রাখা উচিত। ভক্তি আর বিস্ময়ের মেলবন্ধন দেখতে একবার ঘুরে আসুন বেতাহারের নড়বড়িয়া শিব মন্দিরে।
