বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসব ঝুলন যাত্রা। শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার এই স্বর্গীয় উৎসবের মাহাত্ম্য, তিথি ও আমাদের ছোটবেলার কিছু নস্টালজিক স্মৃতি নিয়ে বিস্তারিত।
ঝুলন যাত্রা: রাধা-কৃষ্ণের প্রেমোৎসব ও আমাদের ছোটবেলার কিছু হারিয়ে যাওয়া নস্টালজিক স্মৃতি
বর্ষার রিমঝিম শব্দ, কদম ফুলের গন্ধ আর মাটির সোঁদা গন্ধের মাঝেই আগমন ঘটে বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় এক উৎসবের— ঝুলন যাত্রা। শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারামনের এই দোলনা উৎসব বা দোলানো পর্ব সনাতন ধর্মে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসের দ্বাদশী তিথি থেকে শুরু হয়ে পূর্ণিমা অর্থাৎ রাখী পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে এই ঝুলন উৎসবের আনন্দ।
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় ঝুলন আসা মানেই ছিল এক অন্যরকম উত্তেজনা। পাড়ার বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে জুতোর বাক্স, কাদা মাটি আর ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে ছোট ছোট পাহাড়, নদী আর বাগান বানানোর ধুম পড়ে যেত। আজ সেই পুরনো দিনের নস্টালজিয়া আর ঝুলন যাত্রার আসল মাহাত্ম্য নিয়েই একটু গল্প করা যাক।
ঝুলন যাত্রার আসল পৌরাণিক মাহাত্ম্য কী?
ঝুলন যাত্রা মানে শুধুই আনন্দ বা মেলা নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর এক আধ্যাত্মিক দর্শন। দ্বাপর যুগে ব্রজভূমিতে, বিশেষ করে বৃন্দাবন ও মথুরায় এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল।
শ্রাবণের মেঘলা দিনে যখন চারপাশ সবুজে ভরে ওঠে, তখন লতা-পাতায় ঘেরা কুঞ্জে রাধা এবং কৃষ্ণকে দোলনায় বসিয়ে সখীরা মনের আনন্দে দোলা দিতেন। একেই বলা হয় 'ঝুলন লীলা'। এই দোলনা বা ঝুলা আসলে মানুষের হৃদয়ের প্রতীক। ভক্তের ভালোবাসার দোলাতেই ভগবান আন্দোলিত হন— এটাই ঝুলনের মূল কথা।
আমাদের বৈষ্ণব ধর্মে এই উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। মায়াপুরের ইসকন মন্দির থেকে শুরু করে শান্তিপুর বা নবদ্বীপের প্রাচীন বাড়িগুলোতে এই পাঁচ দিন ধরে রাধা-মাধবের বিগ্রহকে অপরূপ সাজে সাজিয়ে দোলনায় দোলানো হয়।
ছোটবেলার সেই মাটির ঝুলন আর আজকের দিনকাল
আমার এক বাল্যবন্ধু শুভ্রর কথা খুব মনে পড়ে। ও মাটি দিয়ে চমৎকার সব ছোট ছোট পুতুল আর ঘরবাড়ি বানাতে পারত। আমরা ওর বাড়ি থেকে পিটুলি বা চ্যালা কাঠ চেয়ে এনে কৃত্রিম জঙ্গল বানাতাম। সেখানে প্লাস্টিকের বাঘ, সিংহ, হরিণ সাজিয়ে রাখতাম। আর প্রতিদিন সন্ধেবেলা মাটির প্রদীপ জ্বেলে আরতি করা হতো।
আজকের ফ্ল্যাট কালচারের যুগে এসে সেই মাটির ঝুলন সাজানোর চলটা যেন অনেকটাই কমে গেছে। এখনকার বাচ্চারা মোবাইলের স্ক্রিনেই বেশি ব্যস্ত। তাও কিছু কিছু জায়গায় এখনও মাটির পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলা থেকে কেনা রঙিন মাটির চিল, উট বা চাষী-বউয়ের পুতুলগুলো আজও মনের কোণে এক অদ্ভুত ভালোলাগা জাগিয়ে তোলে।
ইসকন এবং নবদ্বীপের ঝুলন উৎসব: এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা
আপনি যদি কখনো ঝুলন যাত্রার সময় মায়াপুর ইসকন মন্দির বা নবদ্বীপে যান, তবে সেই অভিজ্ঞতা সারাজীবন মনে রাখার মতো।
বিগ্রহের সাজ: প্রতিটা দিন রাধা-কৃষ্ণকে আলাদা আলাদা থিমের পোশাকে এবং গয়নায় সাজানো হয়। কখনো সবুজ কুঞ্জ থিম, কখনো আবার পুরো দোলনাটাই সাজানো হয় সুগন্ধী ফুল দিয়ে।
কীর্তন ও ভজন: দিনভর চলে সুমধুর হরিনাম সংকীর্তন। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত এসে এই উৎসবে শামিল হন।
ছাপ্পান্ন ভোগ: ঝুলন পূর্ণিমার দিন রাধা-মাধবকে ৫৬ রকমের পদ রেঁধে ভোগ নিবেদন করা হয়, যা দেখার জন্য উপচে পড়ে ভিড়।
আমাদের ঘরে কীভাবে ঝুলন উদযাপন করতে পারি?
বড় করে প্যান্ডেল বেঁধে বা মেলা প্রাঙ্গণে না গেলেও, নিজের ঘরের ঠাকুরঘরেই কিন্তু খুব সুন্দরভাবে ঝুলন পালন করা যায়।
১. আপনার ঘরের গোপাল সোনা বা রাধা-কৃষ্ণের ছোট মূর্তিটিকে জল দিয়ে ভালো করে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দিন। ২. একটি ছোট কাঠের বা পিতলের দোলনা কিনে তা গাঁদা ফুল এবং তুলসী পাতা দিয়ে সাজাতে পারেন। ৩. এই পাঁচ দিন ঠাকুরকে ফল, মিষ্টি বা ঘরের তৈরি পায়েস ভোগ দিন। ৪. সন্ধেবেলা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে আলতো করে দোলনাটি দুলিয়ে রাধা-কৃষ্ণের নাম জপ করুন। বিশ্বাস করুন, এতে মনে এক অদ্ভুত শান্তি পাওয়া যায়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ঝুলন যাত্রা সাধারণত কোন মাসে অনুষ্ঠিত হয়?
ঝুলন যাত্রা প্রতি বছর হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথি থেকে শুরু হয়ে শ্রাবণী পূর্ণিমা (রাখী পূর্ণিমা) পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার মতে এটি সাধারণত আগস্ট মাসে পড়ে।
২. ঝুলন উৎসব মোট কতদিন ধরে চলে?
এই পবিত্র উৎসবটি টানা ৫ দিন ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করা হয়।
৩. ঝুলন পূর্ণিমার সাথে অন্য কোন উৎসবের মিল রয়েছে?
ঝুলন যাত্রার শেষ দিনটি হলো ঝুলন পূর্ণিমা, যা সারা ভারত জুড়ে 'রাখী পূর্ণিমা' বা 'রক্ষা বন্ধন' হিসেবে ধুমধাম করে পালিত হয়।
যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে এই ঝুলনের দিনগুলোতে চলুন না আরও একবার ফিরে যাই সেই শৈশবে। মনের ভেতরের আনন্দকে দোলা দিয়ে জাগিয়ে তুলি।
রিডিং টাইম: ৪ মিনিট
লেখাটি পড়ে যদি আপনারও ছোটবেলার ঝুলন সাজানোর কথা মনে পড়ে যায়, তবে কমেন্ট করে জানান আর বন্ধুদের সাথে ফেসবুকে শেয়ার করুন!
