কার্তিক মাসের অমাবস্যার পর যখন চাঁদ আকাশে উঁকি দেয়, ঠিক তার কয়েকদিন পরেই শুরু হয় চার দিনের এক কঠোর তপস্যা। কোথাও কোনো আড়ম্বর নেই, নেই মূর্তি পূজার বাহুল্য। শুধু আছে শুদ্ধতা, নিষ্ঠা আর সূর্যদেব ও ষষ্ঠী দেবীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। হ্যাঁ, আজ আমরা কথা বলছি ছট পূজা (Chhath Puja) নিয়ে।
১. ছট পূজা আসলে কী?
ছট পূজা হলো মূলত সূর্যদেব ও তাঁর স্ত্রী ষষ্ঠী বা ছটী মাইয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উৎসব। বিহার, ঝাড়খন্ড এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া এই উৎসব আজ পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতে এক মহামিলনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। ছট মানে ‘ষষ্ঠী’, যা শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয়।
২. কেন এই পূজা করা হয়? (পৌরাণিক তাৎপর্য)
ছট পূজার পেছনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন:
- ঋষি ও তপস্বীদের প্রথা: প্রচলিত আছে যে, মাতা সীতা এবং দ্রৌপদী সূর্যদেবের কৃপা লাভের জন্য এই ব্রত পালন করেছিলেন।
- শারীরিক ও মানসিক শুদ্ধি: দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা জল না খেয়ে (নির্জলা) উপবাসের মাধ্যমে শরীর ও মনকে শুদ্ধ করার নামই ছট।
- প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা: সূর্য হলো শক্তির আধার। তাই শস্য ফলানো এবং জীবন রক্ষার জন্য সূর্যদেবকে ধন্যবাদ জানাতেই এই পূজার আয়োজন।
৩. চার দিনের কঠিন নিয়ম ও ব্রত
ছট পূজার বিশেষত্ব হলো এর নিয়মনিষ্ঠা। এটি চারদিন ধরে চলে:
- নহায় খ্যায় (Nahay Khay): প্রথম দিন স্নান সেরে ঘরবাড়ি পবিত্র করে নিরামিষ আহার গ্রহণ।
- খরনা (Kharna): দ্বিতীয় দিন সারাদিন উপবাসের পর সন্ধ্যায় গুড়ের পায়েস ও রুটি ভোগ হিসেবে গ্রহণ করা। এর পর থেকে ৩৬ ঘণ্টার নির্জলা ব্রত শুরু।
- সন্ধ্যা অর্ঘ্য: তৃতীয় দিন নদী বা পুকুরের জলে দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য দান।
- ঊষা অর্ঘ্য: শেষ দিন ভোরে উদীয়মান সূর্যকে অর্ঘ্য দিয়ে ব্রত ভঙ্গ করা।
৪. ছট পূজার সাজ ও পরিবেশ
ছট পূজায় কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। মা নিজেই নিজের পূজারী। নদী বা ঘাটের পরিবেশ তখন এক অন্যরকম আবেশে ভরে ওঠে। বাঁশের তৈরি 'সূপ' বা কুলোতে নতুন ফসল, মিষ্টি আর ফলের ডালা সাজিয়ে সূর্যদেবকে নিবেদন করা হয়। সেই সূপের ডালা মাথায় নিয়ে ঘাটে যাওয়ার দৃশ্য সত্যিই বড় অদ্ভুত আর সুন্দর।
৫. কেন এই উৎসব আমাদের শেখার মতো?
ছট পূজা আমাদের শেখায় ধৈর্য ও শৃঙ্খলা। ভোগের আড়ম্বরের চেয়েও এখানে ভক্তির বিশুদ্ধতা অনেক বেশি। এই উৎসব কোনো জাতপাত মানে না, মানে কেবল মানুষের সাথে প্রকৃতির এক নিবিড় সংযোগ।
৬. শেষ কথা
ছট পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আলোর উৎস তো সূর্যই। আর সেই আলোকে আমরা যদি আমাদের অন্তরে ধারণ করতে পারি, তবেই তো জীবন সার্থক। আপনারা কি কখনো ছট পূজার ঘাটে গেছেন? সেই অগণিত প্রদীপ আর পবিত্র সুরের আবেশ কখনো অনুভব করেছেন? কমেন্ট করে আমাদের সাথে আপনাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন!
